আমিনুল ইসলাম : ঢাকাগ্রাফ
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অস্থায়ী ও স্থায়ী গরুর হাট প্রস্তুতের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত হাটগুলোতে বাঁশ, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা অবকাঠামো তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। তবে হাট প্রস্তুতির এই শেষ সময়ে খামারিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশের আশঙ্কা।
দেশীয় খামারিরা বলছেন, প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের কয়েকদিন আগে অবৈধ পথে ভারতীয় গরু ঢুকলে দেশীয় পশুর দাম পড়ে যেতে পারে। এতে ক্ষতির মুখে পড়বেন লাখো খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।
রাজধানীর গাবতলী হাটে প্রস্তুতি দেখতে আসা ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম বলেন, “এবার দেশীয় গরুর সরবরাহ ভালো। খামারিরা অনেক আশা নিয়ে গরু প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু শেষ সময়ে ভারতীয় গরু ঢুকলে বাজার ভেঙে যাবে।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নগরবাসীর সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে হাটগুলোতে সিসিটিভি, অস্থায়ী মেডিকেল টিম, বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি যেন ক্রেতা-বিক্রেতারা নিরাপদ পরিবেশে কেনাবেচা করতে পারেন।”
রাজধানীর আফতাবনগর, মেরাদিয়া ও উত্তরার অস্থায়ী পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে গরু আনতে শুরু করেছেন। কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা খামারিরা জানান, গত এক বছরে পশুখাদ্য, ভুসি, খড় ও ওষুধের দাম অনেক বেড়েছে। ফলে তারা ন্যায্যমূল্য না পেলে বড় ধরনের লোকসানে পড়বেন।
সিরাজগঞ্জের খামারি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “একটা গরু লালন-পালনে আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হয়েছে। এখন যদি সীমান্ত দিয়ে কম দামে ভারতীয় গরু আসে, তাহলে আমাদের পথে বসতে হবে।”
অন্যদিকে অনেক ক্রেতা বলছেন, দেশীয় গরুর দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। তাই তারা অপেক্ষা করছেন ঈদের আগের শেষ কয়েকদিনের জন্য। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, “প্রতি বছর শেষ দিকে দাম কিছুটা কমে। বাজার পরিস্থিতি দেখে কিনবো।”
খুলনা ও যশোর সীমান্ত এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় ইতোমধ্যে গরু প্রবেশের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে দেশীয় উৎপাদন দিয়েই কোরবানির বাজার সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাজারে আতঙ্ক ও সিন্ডিকেটের প্রভাব ঠেকাতে কার্যকর মনিটরিং জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশ্লেষক ড. মাহফুজ কবির বলেন, “বাংলাদেশ গত এক দশকে পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়েছে। এখন যদি অবৈধভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশ করে, তাহলে দেশীয় খামারিরা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সীমান্তে কড়া নজরদারি, হাটে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।”
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, হাট ইজারাদারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন অতিরিক্ত হাসিল আদায়, চাঁদাবাজি বা জোরপূর্বক দখলের মতো ঘটনা না ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও বাড়ানো হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির পশুর বাজার শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অংশ। তাই দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা, ক্রেতাদের স্বস্তি এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

