বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, শিল্পাঞ্চল স্থাপনসহ অবকাঠামোগত সহযোগিতা বিশেষ করে তিস্তা নিয়ে কারিগরি সহায়তার আশ্বাস এবং রাজনৈতিক বার্তা— সব মিলিয়ে সফরটি সরকারকে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অবস্থান এনে দিয়েছে। কিন্তু কূটনীতির বাস্তবতা হলো, প্রতিটি অর্জন নতুন দায়িত্বও সৃষ্টি করে।
বেইজিং থেকে ফেরার পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর চীন নয়; প্রশ্ন হলো ভারতকে কীভাবে সামলানো হবে। কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা কোনো বৈশ্বিক শক্তি নয়, বরং তার ভৌগোলিক অবস্থান। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। এই বাস্তবতা পরিবর্তন হয়নি, বরং সাম্প্রতিক সফরের পর আরও স্পষ্ট হয়েছে।
চীন সফরের আগে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমনিতেই আস্থার সংকটে ছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে নানা ইস্যু সামনে এসেছে। কখনো সীমান্তে উত্তেজনা, কখনো ভিসা, কখনো শেখ হাসিনার অবস্থান, কখনো সংখ্যালঘু প্রশ্ন, আবার কখনো রাজনৈতিক বক্তব্য— একটি সমস্যা শেষ না হতেই আরেকটি নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা জটিল খেলায় পরিণত হয়েছে। একটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলাকালেই আরেকটি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে এই চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে।
ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়নি। বরং গত কয়েক মাসে নয়াদিল্লি একাধিক ইতিবাচক বার্তা এসেছে। অব্যাহত রয়েছে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় সংলাপের দরজা খোলা রাখা হয়েছে, এবং প্রকাশ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে উভয় পক্ষই। ভারতও উপলব্ধি করছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ সম্পর্ক তার নিজের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের জন্যও ব্যয়বহুল। অর্থাৎ, সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ এখনও রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশেরও সমান উদ্যোগী হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর সেটি আরও বেশি সময়োপযোগী হয়ে উঠলো।
বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভারতের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি হলে তার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হবে বাংলাদেশকেই।
প্রথম কারণ, পানি। বাংলাদেশের প্রায় সব আন্তঃসীমান্ত নদীর উৎস ভারতের ভেতরে। তিস্তা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, তিস্তার পানিবণ্টনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ঢাকা ও নয়াদিল্লিকেই নিতে হবে। চীন প্রকৌশল সহায়তা দিতে পারে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে পারে, নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সহযোগিতা করতে পারে; কিন্তু পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত চীন নেবে না।
একই বাস্তবতা গঙ্গা নিয়েও। বর্তমান গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান কৃষি চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যদি আরও অবিশ্বাসের দিকে যায়, তবে তিস্তা এবং গঙ্গা— দুটি প্রশ্নই আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ, সীমান্ত নিরাপত্তা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি। চোরাচালান, মানবপাচার থেকে শুরু করে বর্তমানের অনুপ্রবেশ বা পুশইন ইস্যু- এসব কোনো একক রাষ্ট্র একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এগুলোর সমাধান হয় যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে। সম্পর্ক যত খারাপ হবে, সীমান্ত তত অস্থির হবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে অনিয়মিত অভিবাসন ও পুশ-ইন নিয়ে যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দেখা যাচ্ছে, তা রাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবর্তে কার্যকর নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা করাই উভয় দেশের স্বার্থের জন্য উত্তম।
তৃতীয় কারণ, দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত। বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চল এখন কেবল একটি সীমান্ত এলাকা নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, আরাকান অঞ্চলের সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর গতিবিধি— এসবের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের উপর পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অভিন্ন। উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা দুর্বল হলে এর সুযোগ নেবে কেবল অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র।
চতুর্থ কারণটি অর্থনৈতিক। বাংলাদেশ যতই চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করুক না কেন, ভারতের বাজার, বিদ্যুৎ সংযোগ, স্থলবন্দর, আঞ্চলিক পরিবহন এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বাস্তব ও দৈনন্দিন গুরুত্ব বহন করে।
ভ‚গোলকে পাশ কাটিয়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা যায় না। এই বাস্তবতাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় শক্তি। চীন সফরের সময় তিস্তা ইস্যু নিয়ে বেইজিং অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। চীনা কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে তাদের সহযোগিতা কারিগরি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। এই অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— চীন নিজেও বাংলাদেশকে ভারতবিরোধী কৌশলগত প্রতিযোগিতার সামনের সারিতে দেখতে চায় না। অর্থাৎ, বেইজিংও চায় ঢাকা যেন নয়াদিল্লির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখে। এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধী বক্তব্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ এনে দিতে পারে। তিস্তা, সীমান্ত কিংবা দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করাও সহজ। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে হয় না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বলছে, চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্কও সমান অপরিহার্য। বাংলাদেশের উচিত এখন আবেগনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তে ইস্যুভিত্তিক কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করা। যেখানে পানি নিয়ে পানি, সীমান্ত নিয়ে সীমান্ত, নিরাপত্তা নিয়ে নিরাপত্তা এবং অর্থনীতি নিয়ে অর্থনীতি— প্রতিটি বিষয়ে আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ চলবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন বাস্তব সহযোগিতাকে অচল না করে।
চীন সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা তখনই বাস্তবে রূপ নেবে, যখন ঢাকা একই সঙ্গে বেইজিং ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারবে। বাংলাদেশের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চীনকে পাওয়া নয়। বরং চীনকে পাওয়ার পর ভারতকে হারিয়ে না ফেলা। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং ভূগোল— সবই একটি বিষয় শেখায়। মহাশক্তিরা আসে, যায়, অগ্রাধিকার বদলায়। কিন্তু প্রতিবেশী বদলায় না। সেই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের আগামী কূটনীতির ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে।

