৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি – বাড়ছে খাদ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
খুলনা প্রতিনিধি
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিঘাত এখন দৃশ্যমান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায়। গত তিন দশকে এ অঞ্চলে ফসলি জমি কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ, লবণাক্ততার বিস্তারে অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক মানুষ জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কিংবা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে ফিরে আসছেন। সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবন যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক অবিরাম সংগ্রামের নাম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাবে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে তাদের জীবনযাত্রা। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে, নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতি ও কৃষিজমি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই জীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবজীবন, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, সুপেয় পানির সরবরাহ, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উপকূলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কমছে। বহু জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকছে। কৃষিকাজে আয় কমে যাওয়ায় অনেক পুরুষ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ছে নারীদের কাঁধে। সন্তান লালন-পালন, বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা, সুপেয় পানি সংগ্রহ এবং সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিদিন রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, কৃষিকাজ, মাছ ও চিংড়ির পোনা সংগ্রহসহ নানা কাজে তাদের লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এই পানি ব্যবহারের ফলে জরায়ু সংক্রমণ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, সাদা স্রাব, চর্মরোগ, কিডনি জটিলতা এবং বিভিন্ন প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত এবং অপরিণত শিশুর জন্মের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের প্রতিদিন সুপেয় পানির জন্য দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। কোথাও কোথাও একটি নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। জ্বালানির জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে অনেককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনাঞ্চলে যেতে হয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত চাপ বহন করছেন নারীরাই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২৩ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পরিবারকে সুপেয় পানি সংগ্রহে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। একই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে খুলনায় নবজাতক মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এবং বাল্যবিবাহের হারও অন্যতম উচ্চ। দাকোপ উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের সঙ্গে গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, গর্ভপাত ও অপরিণত শিশুর জন্মের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের “শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বসবাসকারী নারীদের গর্ভপাতের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত প্রভাব পড়ছে খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। সুপেয় পানির সংকট এবং লবণাক্ত পানির ব্যবহার নারীদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক নারী জরায়ুর সমস্যা নিয়ে স্থানীয় কিছু ক্লিনিকে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ত্রাণ বা দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, বিকল্প কর্মসংস্থান, নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন উপকূলের মানুষের অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে। ফসলি জমি হারিয়ে যাওয়া, খাদ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবিকার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে সুন্দরবন উপকূলের মানুষ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


