কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে মৃত্যুর আগের রাতে তার চলাচলের চিত্র পাওয়া গেছে। তবে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং কীভাবে ধানক্ষেতের কাছে পৌঁছেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর হোটেলের পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে। এ সময় দোকানিকে তাজমিনকে কিছু দেখাতে বা কোনো দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়।
ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখার পর সেখান থেকে অন্য পাশে চলে যায় তাজমিন। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তবে এরপর তার চলাচলের পথের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ এখনো পাওয়া যায়নি। সে কোথায় গিয়েছিল এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করেছে পুলিশ। এ কারণে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে সে কোনো অটোরিকশায় উঠেছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে জব্দ করা অটোরিকশাটির সঙ্গে তাজমিনের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় বেড়ে ওঠা তাজমিন ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চার দিন আগে এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যায় তাজমিন। পরে ওই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। ওই রাতে বাবা আবদুল আলীম একাধিকবার মেয়ের মুঠোফোনে কল করলেও সে ফোন ধরেনি। এতে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
পুলিশি অনুসন্ধানে তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তবে এসব স্থানে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, ‘আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট বাসা থেকে বের হয়ে যেত। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক, সেটাই চাই।’
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিহতের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
মোস্তাইন বিল্লাহ আরও বলেন, জব্দ করা অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তদন্ত করছি। আশা করি, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন হবে।’
E_01

