উপজেলা পর্যায়ে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা, সংকট ওষুধ-জনবলে

0
3

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা উপজেলা পর্যায়ে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নার। তবে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে এসব সেবার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার খন্দকপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. রফিক মিয়া (৫৫) উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে নিয়মিত ফলোআপে আসেন এবং প্রাপ্যতা অনুযায়ী এক মাসের ওষুধ সংগ্রহ করেন।

রফিক মিয়া বলেন, আগে এ ধরনের সেবা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। রক্তচাপ মাপার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কক্ষও বরাদ্দ ছিল না। এখন নিয়মিত এনসিডি কর্নারে এসে রক্তচাপ মাপাতে পারছেন। চিকিৎসক ও নার্সের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধও সেবন করছেন।

স্বাস্থ্য খাতে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। এ অবস্থায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এনসিডি কর্নারের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০১৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ’ পরিচালিত হচ্ছে। এ উদ্যোগের আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঠামোবদ্ধ সেবা জোরদার করা হচ্ছে।এনসিডি কর্নারে রোগীদের নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং নিয়মিত ফলোআপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে হৃদরোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের দীর্ঘ সময়, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন, নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি হলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এনসিডি কর্নারে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, রোগী শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করাও জরুরি।এনসিডি সেবার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ পর্যাপ্ত জনবল না থাকা। এনসিডি কর্নারগুলোকে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমিত জনবল দিয়ে কাঙ্ক্ষিত মানের নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাকির হোসাইন বলেন, এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীরা নিজ এলাকার কাছাকাছি নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারছেন। তবে এ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সর্বশেষ ২০২৫ সালের শেষ দিকে জাতীয় প্রোটোকল অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পাঁচ ধরনের সরকারি ওষুধ বরাদ্দ পেয়েছিল। সেসব ওষুধ এখন প্রায় শেষের দিকে। এনসিডি কর্নারে পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকলে স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, জেলার আওতাধীন এনসিডি কর্নারগুলোতে প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি রোগীদের স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এমএসআর ফান্ড ব্যবহার করে ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমএসআর ফান্ড দিয়ে ইনডোরসহ বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা হয়। ফলে জাতীয় প্রোটোকল অনুযায়ী এনসিডির প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে কেনা উপজেলা পর্যায়ে কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, এনসিডি ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ময়মনসিংহ জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।

বিশ্ব হার্ট দিবসে যখন হৃদস্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ চলছে, তখন বাংলাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারগুলো সেই সচেতনতাকে বাস্তব সেবায় রূপ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সুফল ধরে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ, পর্যাপ্ত জনবল এবং রোগীদের ধারাবাহিক ফলোআপ নিশ্চিত করা।

E_11

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here