আইএস যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন বাবা | সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে
কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার পর ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এক যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া হালিমা সালমানের। আইএসের কাছ থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। এ অপরাধে তাঁর সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সাজা ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মামলার রায় ঘোষণার পর হালিমা, তাঁর মা ও আইনজীবীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তবে তাঁর আইনজীবীরা রায় বাতিল করে খালাস দেওয়ার আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন আইনজীবীদের দাবি, হালিমা আইএসের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলেন এবং স্বেচ্ছায় সংগঠনটির কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন। বিচার চলাকালে আদালতে এমন একটি ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে তাঁর হাতে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দেখা যায়। এ ছাড়া আইএসের পতাকার সঙ্গে তাঁর একটি ছবিও উপস্থাপন করা হয়।
ব্রুকলিনের মার্কিন অ্যাটর্নি জোসেফ নোসেলা জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে হালিমাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
তবে হালিমার আইনজীবীদের বক্তব্য, কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার পর তিনি গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়েন। তাঁর বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং সে সময়কার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলেও তাঁদের অবস্থান।
তুরস্কে যাওয়ার কথা বলে সিরিয়ায় নিয়ে যাওয়া
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া হালিমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন ২০১৭ সালে তাঁর বাবা পুরো পরিবারকে নিয়ে সিরিয়ায় যান। হালিমার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ভেবেছিলেন, তাঁরা তুরস্কে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের বহনকারী ভ্যানটি সিরিয়ায় প্রবেশ করার পর মুখোশ পরা কয়েকজন বন্দুকধারী তাঁদের ঘিরে ধরে।
আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে হালিমা বলেন, তিনি ভয় পেয়েছিলেন এবং কী ঘটছে, তা বুঝতে পারছিলেন না। তাঁর বাবা তাঁদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল না। সে সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যা ঘটেছে, তার অনেক কিছুর জন্যই তিনি তাঁর বাবাকে দায়ী করেন।
হালিমা জানান, পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হওয়ার আগে তাঁকে তিন মাস আইএস পরিচালিত একটি আবাসনকেন্দ্রে থাকতে হয়েছিল। বিমান হামলায় তাঁদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়।
আইএস যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে ও অস্ত্র প্রশিক্ষণের অভিযোগ
হালিমার বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় তাঁর বাবা তাঁকে আইএসের এক যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে উঠে দাঁড়াতে এবং স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা বলেছিলেন।
বিয়ের অধিকাংশ সময় তিনি স্বামী ও শাশুড়ির জন্য ঘরের কাজ করতেন বলে আদালতে জানান। ২০১৮ সালে বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর বাবা মারা যান।
অন্যদিকে, মার্কিন কৌঁসুলিদের দাবি, হালিমা শুধু আইএসের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবস্থান করেননি; তিনি সংগঠনটির কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী তাঁর হাতে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থাকার ভিডিও ধারণ করেছিলেন বলে অভিযোগপক্ষ জানায়।
তবে হালিমা সাক্ষ্যে বলেন, স্বামীর অনুরোধেই তিনি রাইফেলটি হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন, সিরিয়ায় তাঁর অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্বামীর কাছে পাঠানো বার্তা নিয়ে প্রশ্ন
বিচার চলাকালে হালিমার স্বামীর কাছে পাঠানো দুটি স্নেহপূর্ণ খুদে বার্তা আদালতে উপস্থাপন করেন কৌঁসুলিরা। তাঁর দাম্পত্য জীবন ভালো ছিল না—হালিমার এই বক্তব্যের সঙ্গে বার্তাগুলোর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
এ ছাড়া জেরার সময় তাঁকে স্বীকার করতে বলা হয়, তিনি একবার ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে একটি ধর্মীয় গান স্বামীকে পাঠিয়েছিলেন। অভিযোগপক্ষের মতে, এসব তথ্য থেকে আইএসের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সমাপনী বক্তব্যে সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নি আমান্ডা শামি বলেন, উপস্থাপিত প্রমাণে দেখা গেছে, হালিমা একটি সহিংস সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, হালিমার পক্ষ থেকে তাঁর বয়স, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে আটকে পড়ার অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে পালিয়ে যাওয়া
হালিমা জানান, তাঁদের দাম্পত্য জীবনের শেষ বছরটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রায়ই বোমা হামলা হতো এবং কখনো কখনো হামলার কারণে তাঁদের রাস্তায় রাত কাটাতে হতো। পরে অন্য শরণার্থীদের সঙ্গে একটি ট্রাকে করে তাঁরা পালিয়ে যান।
ট্রাকে থাকতেই তিনি স্বামীকে জানান, তাঁরা আলাদা হয়ে যাবেন। এরপর আর কখনো স্বামীকে দেখেননি বলে আদালতে জানান হালিমা।
২০১৯ সালে সিরিয়ার বাঘুজ এলাকায় আইএসবিরোধী বাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ফিরে এলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
রায় বাতিলের আবেদন করবেন আইনজীবীরা
রায় ঘোষণার পর হালিমা, তাঁর মা ও আইনজীবীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে আদালতকক্ষের রেলিংয়ের দুই পাশে দাঁড়িয়ে হালিমা ও তাঁর মা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
মামলার বিচারকেরা রায় নিয়ে আলোচনার সময় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সমস্যার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত দেন।
হালিমার আইনজীবীরা রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেওয়ার আবেদন করতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে, উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব না হলে বিচারক রায় বাতিল করে খালাস দিতে পারেন। তবে এ ধরনের আবেদন সচরাচর মঞ্জুর হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার আইএসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৪ সালে গোষ্ঠীটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে তথাকথিত খিলাফত ঘোষণা করেছিল। ২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় তাদের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে। এরপরও দুই দেশে সংগঠনটির গোপন উপস্থিতি ও হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
হালিমার মামলায় আদালতের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আইনি নিষ্পত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন রায় বাতিলের আবেদন এবং আগামী ২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সাজা ঘোষণার দিকে নজর থাকবে।
E_04

