শাব্বির এলাহী, মৌলভীবাজার
ভারত থেকে বয়ে আসা খরস্রোতা স্রোতস্বিনী ধলাই উপত্যকার উর্বর জনপদ কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক ও হামহাম জলপ্রপাত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অনন্য আকর্ষণ। বছরের বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নৈসর্গিক এ প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো দেখতে ছুটে আসেন নানা শ্রেণী পেশার হাজার হাজার পর্যটক। বিশেষ করে দুই ঈদ ও পূজার ছুটি এবং মনিপুরী রাস পূর্ণিমা উপলক্ষে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলা নিকেতন সবুজ এ জনপদের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ, গারো টিলা, খাসিয়া পুঞ্জি প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান দেখতে পর্যটকদের ঢল নামে। বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স , বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য রাজকান্দি বন, শমসেরনগর বিমানবন্দর, প্রাচীন ঐতিহ্যের বাহক লক্ষীনারায়ন দিঘী, ২শ বছরের প্রাচীন ছয়চিড়ী দিঘী, শমসেরনগর বাগীছড়া লেক, আলীনগর পদ্মলেক, মাগুরছড়া পরিত্যক্ত গ্যাসফিল্ড, অপরূপ শোভামন্ডিত উঁচু নিচু পাহাড়বেষ্টিত সারিবদ্ধ চা বাগানসহ বাংলাদেশের বৃহৎ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মণিপুরী সম্প্রদায়ের নিরাপদ আবাসস্থল এ উপজেলায়। এছাড়া প্রকৃতির পূজারী খাসিয়া নৃ-গোষ্ঠীসহ গারো, সাঁওতাল, মুসলিম মণিপুরী, টিপরা ও গারোদের নিরাপদ আবাসস্থলও রয়েছে এই উপজেলায়।নাগরিক জীবনের শত ব্যস্ততার মধ্যে একটু ছুটি মিললেই অনেকেই ছুটে যান সাগর-পাহাড়-অরণ্য ও ঐতিহ্যের সান্নিধ্যে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোও মুখরিত হয় পর্যটক দর্শনার্থীদের পদভারে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপসজ্জা দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা। আর এই ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে কমলগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্রগুলো। উপজেলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ জনপদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কমলগঞ্জের বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের সাতটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও দশটি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। এই বনের পরিচিতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়ার অবস্থান। চিরহরিৎ এ বনাঞ্চল বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের নিরাপদ আবাসস্থল। এছাড়াও নানা ধরণের দুর্লভ প্রাণী, কীটপতঙ্গ আর গাছপালার জন্য এ অরণ্য বিখ্যাত। এ উপজেলায় পাহাড়ি উঁচুনিচু টিলার উপর সবুজ চা বাগানবেষ্টিত, জাতীয় ফুল দুর্লভ বেগুনি শাপলার আধিপত্যে আনন্দের বাড়তি মাত্রা যুক্ত করবে পদ্মকন্যা মাধবপুর লেক। মাধবপুর লেকের দৃশ্য উপভোগ করে বেরিয়ে এসে একই রাস্তায় প্রায় ১০ কিলোমিটার যাওয়ার পরই রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ। কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি বন রেঞ্জের কুরমা বনবিট এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন হামহাম জলপ্রপাত। স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীরা এ জলপ্রপাতের ধ্বনিকে হামহাম বলে। এ বনের ভেতরেই রয়েছে সম্প্রতি আবিষ্কৃত ফিকল ঝরনা। বনের কুরমা খাসিয়া পুঞ্জির পাশেই দৃষ্টি নন্দন এ ঝরনার অবস্থান। সেখানে সরাসরি যানবাহন নিয়ে পৌঁছার ব্যবস্থা নেই। বাসে এবং সিএনজি যোগে কুরমা চেকপোস্ট যাওয়ার পর বাকি পথ হেঁটে যেতে হয় হামহাম জলপ্রপাত ও ফিকল ঝরনায়। হামহাম জলপ্রপাতে ভ্রমণ করতে পুরো একদিনের প্রয়োজন। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময়ে গড়ে ওঠা একটি বিশালাকার বিমানবন্দর রয়েছে শমশেরনগরে। বর্তমানে এখানে রিক্রুট ট্রেনিং স্কুল করায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হলেও এ এলাকা সংলগ্ন স্থানেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি বধ্যভূমি। এ উপজেলার আরেকটি আকর্ষণীয় স্পট হচ্ছে ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ডেবলছড়া খাসিয়াপল্লী। যদিও ডেবলছড়া খাসিয়াপল্লী যেতে পাহাড়ি উঁচু-নিচু প্রায় ১২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। তবে পথিমধ্যে শমশেরনগর চা বাগানের দুটি প্রাকৃতিক হ্রদ, একটি গলফ মাঠ ও ক্যামেলিয়া ডানকান হাসপাতাল যে কোনো পর্যটকের নজর কাড়বে। ডবলছড়া খাসিয়া পল্লীতে আড়াই’শ ফুট উপরের হেডম্যান বা মন্ত্রীর বাংলোটি দেখতে খুবই সুন্দর। এ ছাড়াও ভ্রমণের জন্য রয়েছে- কমলগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের নীরব সাক্ষী বধ্যভূমি, ব্রিটিশদের শোষণের প্রতীক তিলকপুর নীলকুটি, ঘটনাবহুল মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ড, মণিপুরী, টিপরা, খাসিয়া, গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসভূমি। বলা যায়, দেশের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য কমলগঞ্জ উপজেলা ধারণ করে, তাই এ উপজেলা কোন নাগরিকের ঠিকমতো দেখা ও জানা হয়ে গেলে অর্ধেক বাংলাদেশ দেখা হয়ে যায়
Date:


